পারগাণা
Monday, April 27, 2020
April 27, 2020
MANOJ MURMU
submenu-1
No comments
পারগাণা
করন চন্দ্র মুর্ম্মূ
বেওরা সাকাম অলকাতে
আড়াঃ কেদাম গটা টঠা
বাজার সাহার আত-ডিহৗত টঠা ।
মিদুন হেলমেল্ হুয়ুঃ কানা দুলদুল
টামাক সাডে ঝৗইকরতাল রেগড়া
রাওয়াঃ কানা লুতুর পেরেচ্ ।
তারক রাকাব কানা সাওঁতা গটা
এনেচ্ সেরেঞ সাওহেৎ অকা
এপের হেণ্ডেচ্ সালাগটা পারগানায় গটায় ।
আয়ুর ইদিয়ায় মুরুক সাওঁতা
টল মলাঃ কান তিরলৗ ধরম
লেসের বেডের লেবেত লটম ।
পারগাণা পারগাণা এপের হেণ্ডেচ্
অকয় কাটিচ্ অকয় লাটুঃ
মৗন মহান ক খজঃ আ ।
লাতার কুলহি চেতান কুলহি
জেলা, পনত, দিশোমরে হাটিঞঃ আক পারগাণা পারগাণা ॥
মিদিনতে মিদুন হেলমেল ক, হ-হয়া সুরসুপুর ঠাওরে ,
জেলা হেলমেল পনত হেলমেল দাড়েক উদুগা পারগানা ।
হড়ক হিজুঃ দুমেল দুমেল
মুরুক হড় অকয় অকাসেন ক সেনঃ আ ?
বাংক বুঝৗউ দাড়েয়া আ
হায়রে মুরুক সাওতা
নিতহঃ মেনাম ভাওতারে ।
সাওঁতা বিসিজাং লাবিদঃ আ
জুমিত দাড়ে চাবাঃ আ ,
সাওঁতা ভৗলৗই কামিরে
এটকে টড়েয় আগুয়া ।
পারগানা আপেগে আকিল
বুদান মানমী চেদাঃ তবে নঙ্কা হাটিঞ ,
হিনৗনিয়ৗ পাটি করাও মেসে
সাওঁতা ভৗলৗয় কামি লাগিত
সাওঁতা ধরম আলম হাটিঞ ।
সারি-সারনা ধরম আতে
এপের হেন্ডেচ্ সাওতা সরম ,
ছাতিক জৗতক লান্দায় ।
সরকার চাঃ এ ছৗটয়ৗর ধরম।
খ্রীষ্টান , বৌদ্ধ ,শিখ ধরম হাতাও মেসে
ঠাই তাম দ ফারাকরে।
মেনাম গেয়া লেটের পেটের
সাওতা রেতাম গরব
ধরম গেতাম দাড়ে।
মিতে সারি সারনা ধরম ঞুতুম আমেটলেম
তবেম ভিনৗয় সারি আর সারনা।
সারিক লৗই সাওতারে সারিগে
এড়ে লৗইতে লাজাও বতর
সারহ সারিগে সারনা দেন,বালেবেকের,
ধৗই বুড়হি সারতে সারি বুকৗই গেল্লেদা।
পিলচু হাড়াম বংশ আব
চেদা ? তবে এপের হেন্ডেচ্ পারগাণা পারগাণা পারগাণা ॥
Sunday, April 26, 2020
April 26, 2020
MANOJ MURMU
No comments
করন চন্দ্র মুর্ম্মূ
বেওরা সাকাম অলকাতে
আড়াঃ কেদাম গটা টঠা
বাজার সাহার আত-ডিহৗত টঠা ।
মিদুন হেলমেল্ হুয়ুঃ কানা দুলদুল
টামাক সাডে ঝৗইকরতাল রেগড়া
রাওয়াঃ কানা লুতুর পেরেচ্ ।
তারক রাকাব কানা সাওঁতা গটা
এনেচ্ সেরেঞ সাওহেৎ অকা
এপের হেণ্ডেচ্ সালাগটা পারগানায় গটায় ।
আয়ুর ইদিয়ায় মুরুক সাওঁতা
টল মলাঃ কান তিরলৗ ধরম
লেসের বেডের লেবেত লটম ।
পারগাণা পারগাণা এপের হেণ্ডেচ্
অকয় কাটিচ্ অকয় লাটুঃ
মৗন মহান
ক খজঃ আ ।
লাতার
কুলহি চেতান কুলহি
জেলা, পনত, দিশোমরে হাটিঞঃ আক পারগাণা পারগাণা
॥
মিদিনতে
মিদুন হেলমেল ক, হ-হয়া সুরসুপুর ঠাওরে ,
জেলা হেলমেল পনত হেলমেল দাড়েক উদুগা পারগানা ।
হড়ক হিজুঃ দুমেল দুমেল
মুরুক হড় অকয় অকাসেন ক সেনঃ আ ?
বাংক বুঝৗউ দাড়েয়া আ
হায়রে মুরুক সাওতা
নিতহঃ মেনাম ভাওতারে ।
সাওঁতা বিসিজাং লাবিদঃ আ
জুমিত দাড়ে চাবাঃ আ ,
সাওঁতা ভৗলৗই কামিরে
এটকে টড়েয় আগুয়া ।
পারগানা আপেগে আকিল
বুদান মানমী চেদাঃ তবে নঙ্কা হাটিঞ ,
হিনৗনিয়ৗ পাটি করাও মেসে
সাওঁতা ভৗলৗয় কামি লাগিত
সাওঁতা ধরম আলম হাটিঞ ।
সারি-সারনা ধরম আতে
এপের হেন্ডেচ্ সাওতা সরম ,
ছাতিক জৗতক লান্দায় ।
সরকার চাঃ এ ছৗটয়ৗর ধরম।
খ্রীষ্টান , বৌদ্ধ ,শিখ ধরম হাতাও মেসে
ঠাই তাম দ ফারাকরে।
মেনাম গেয়া লেটের পেটের
সাওতা রেতাম গরব
ধরম গেতাম দাড়ে।
মিতে সারি সারনা ধরম ঞুতুম আমেটলেম
তবেম ভিনৗয় সারি আর সারনা।
সারিক লৗই সাওতারে সারিগে
এড়ে লৗইতে লাজাও বতর
সারহ সারিগে সারনা দেন,বালেবেকের,
ধৗই বুড়হি সারতে সারি বুকৗই গেল্লেদা।
পিলচু হাড়াম বংশ আব
চেদা ? তবে এপের হেন্ডেচ্ পারগাণা পারগাণা পারগাণা
॥
Wednesday, April 22, 2020
April 22, 2020
MANOJ MURMU
No comments





জোহার শহীদ বীর রঘুনাথ সিং জোহার
জোহার চূয়াড়বিদ্রোহের মহানায়ক রঘুনাথ সিং
★শহীদ রঘুনাথ সিং এর ২২৫ তম জন্ম জয়ন্তী ★
শহীদ রঘুনাথ সিং এর পরিচয়
★ রঘুনাথ সিং পাতর (নয়ন)
★জন্ম : -- ১৭/০২/১৭৯৫
★শহীদ : -- ২৩/০৯/১৮৩৪
★বাল্য/ডাক নাম : -- নয়ন সিং
★পিতা : -- বৈদ্যনাথ সিং
★পিতামহ : -- জগন্নাথ সিং
★জন্মস্থল : -- মালীগড়,দামপাড়া,ধলভূমগড়।
★গোত্র(বংশ) : -- শাণ্ডিল্য।
★মাটি /উক শাশ্মণ/হাড়শালী : -- বেলাবড়মা।
ইতিহাস কথা : ---------
তিন পুরুষ ধরে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই চালান - জগন্নাথ সিং,বৈদ্যনাথ সিং,রঘুনাথ সিং।
১৮০৫ সালের আইন অনুযায়ী "ধলভূম " ইস্টেটকে যদিও জঙ্গলমহল জেলার মধ্যে আনা হয় নি তথাপি ঐ বৎসরেই Regulation XVIII অনুযায়ী ধলভূমের উপর ব্রিটিশদের জমিদারী পুলিশ প্রথা একই ভাবে আরোপিত হয়।
নিজ জমিদারী ফিরে পাওয়ার জন্য ব্রিটিশ বিরোধী অভিযান পরিচালনা করেন বৈদ্যনাথ সিং। ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামের নির্ভীক নেতা বৈদ্যনাথ সিং এর উত্তরসুরী ছিলেন রঘুনাথ সিং(নয়ন সিং)।
ছোটোবেলা থেকেই রঘুনাথ সিং ছিলেন যেমন শান্ত ও নম্র তেমনি ছিলেন সাহসী ও বিচক্ষণ। পরম ধর্মপরায়ন মাতার কাছে ধর্মের কথা শুনে এবং পিতার কাছে তীর ও তলোয়ার চালানো শিখতে শিখতে তাঁর মনে স্বদেশ প্রেমের জন্ম নেয়।
দামপাড়ার ৬০ টি মৌজার জমিদারী। জামবাদ থেকে শুরু করে ঢাকপাথর,ডাঙ্গাকমল,মুড়াকাটি,চাখদা,চাপড়ি,দীঘা, ঝাঁটিঝরনা ইত্যাদি মৌজা।মাত্র দশ বছর বয়সেই অস্ত্র বিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠেন।
ধলভূম,মানভূম,সিংভূম,বরাভূম, বীরভূম, তুঁঙ্গভূম এবং শিখরভূম এই সাতভূমে ভূমিজ শাসকের রাজত্বকাল ছিল।
বালক নয়ন সিং একদিন একা বনে ঘুরতে ঘুরতে আচমকা প্রবল ঝড়ের মুখে পড়লেন আত্মরক্ষার জন্য একটা বটগাছের নীচে দাঁড়ালেন। এই সময় তিনি দেখলেন এক অপূর্ব দৃশ্য। ঝড় তুফানের হাত থেকে বাঁঁচবার জন্য ছোটো একটা বটগাছের নীচটাতে এসে মাটির উপর শুয়ে বিরাট পাথর তুলে নিয়ে একটি গুহার মধ্যে প্রবেশ করল। চারিদিকে তখন বজ্রের মতো মেঘ গর্জন, সাথে বিদ্যুতের ঝলক। প্রবল বর্ষন এবং মেঘগর্জন থেমে গেল শান্ত ও সাহসী বালক রঘুনাথ সিং ঐ জায়গাটিতে গিয়ে ঐ পাথরটিকে তুললেন তার শরীর কেঁপে উঠল। শরীরে এক নতুন শক্তি পেলেন। বটগাছের নীচে বনের দেবতা ভৈরব - ভৈরবী বাস করেন। ঐ রাতেই রঘুনাথ সিং স্বপ্নে দেবদেরীর সাক্ষাৎ পান। পরদিন দেবস্থলে পূজা দিলেন। দামপাড়ার ৬০ মৌজার গ্রামবাসীগণও ভৈরব মন্দিরে পূজা দেন। লাল সিং এর সাহায্যে জামবাদ,বুধরায়,সাই,কানিমহলি,ঘন্টিডুবা, যুগতিডি প্রভৃতি জায়গায় গ্রাম আখড়া খুলে যুবকদের তীর ও তলোয়ার চালানো,লাঠিখেলা এবং কুস্তী লড়বার শিক্ষা দিতে লাগলেন। তখনকার দিনে প্রচলিত এই সবকথা দামপাড়া এলাকাজুড়ে এখনো সবার মুখে মুখে ঘোরে। দামপাড়ার "যুবশক্তির জনক" বলা হত রঘুনাথ সিংকে। মায়ের কথা মত কুইলাপালের জমিদার কন্যাকে তিনি বিবাহ করেন।
ইতিমধ্যে ফিরিঙ্গী সরকার ছোটনাগপুরের জমিদারের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে ঘটশিলায় পৌছে যান ঘাটশিলার জমিদার জগন্নাথ সিং এর সাথেও ব্রিটিশদের চুক্তি হয়। ঘাটশিলার শিবিরে রঘুনাথ সিংকেও ডাকা হয়। চোটনাগপুরের তৎকালীন ইংরেজ শাসক ফার্গুসন ছোটনাগপুর এবং ঘাটশিলার জমিদারদের মতো রঘুনাথ সিংকেও চুক্তিপত্রে সই করতে বললেন। রঘুনাথ সিং ঘৃনাভরে তা প্রত্যাখ্যান করলেন। ফার্গুসনের মুখের উপর তিনি পরিস্কার ভাবে জানিয়ে দিলেন - " দামপাড়া আমার একার নয় ;দামপাড়া সমস্ত দামপাড়াবাসীর এলাকা। এই জন্য আমি একা হস্তাক্ষর করে আপনার দাসত্ব স্বীকার করতে পারি না। তাছাড়া ফিরিঙ্গী সরকারের দাসত্ব আমার পছন্দ নয়।
ফার্গুসন রঘুনাথ সিংকে নানা প্রলোভন দিলেন। তাতেও কাজ না হলে তাঁকে ধমক দেন। অকূতোভয় রঘুনাথ সিং ফার্গুসনের ধমকানিকে বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় না দিয়ে তিনি বলেন 'যদি আমি ফিরে আসি তবে চুক্তি পত্রে হস্তাক্ষর হবে; আর যদি না আসি তবে সিংহের গুহা থেকে ঘুরে আসবেন'। ঘাটশিলার এই ঘটনা পিতৃ বন্ধু লাল সিং কে বলেন রঘুনাথ সিং,শুনে লালসিং এর গর্বে বুক ভরে উঠে এবং আবেগময় কণ্ঠে তিনি বলেন " বেটা তুই দামপাড়ার গৌরব।আমার এটাই তোর উপর গর্ব; তুই যা করেছিস তা ঠিক।আমরা কখনই ফিরিঙ্গী সরকারের আধীনে থাকতে পারিনা ; কোনোমতেই সন্ধি করা যাবে না।যুদ্ধ অনিবার্য, আমাদের তৈরী থাকতে হবে"।রঘুনাথ সিংও সদর্পে বললেন 'জমির কর আমি দেব না ; আর ফর্সা লোকের দাস্ত্বও আমি করব না।যুদ্ধে জিৎ আমাদের হবেই '।
ঘাটশিলায় ইংরেজদের সাথে চুক্তিবদ্ধ না হওয়ার মূহূর্তেই রঘুনাথ সিং উপলদ্ধি করেছিলেন যে যুদ্ধ অনিবার্য। তিনি তাঁর গর্ভবতী পত্নীকে বাবার বাড়ী পাঠিয়ে দিলেন। সমস্ত গ্রামবাসীকে যুগতিডি আখড়াতে ডেকে সভা করলেন। ঘাটশিলায় যা ঘটেছে সভায় সব খুলে বললেন। সভায় তিনি বললেন - 'দামপাড়া আমার জন্মভূমি।জন্মভূমি আমাদের মা'।তাই জন্মভূমিকে বাঁচানো মানে মা- কে বাঁচানো।মা কে বিক্রি করে কেউ কোন দিন সুখী হতে পারে না। মাকে রক্ষা করার জন্য তৈরী থাকতে হবে। বিদেশীদের কর আমরা দেব না আর তাদের দাসত্বও স্বীকার করব না। যুগতিডি সভায় পাঁচটি আখড়ার সমবেত সমস্ত শিক্ষার্থী এবং উপস্থিত গ্রামবাসীগণ রঘুনাথ সিং এর কথা শোনার পর ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে একসাথে গর্জে উঠে শপথ নিলেন মাতৃভূমি দামপাড়া কে রক্ষা করার জন্য শরীরের শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে তাঁরা লড়বেন। তাঁদের নেতা রঘুনাথ সিং কে বিদেশীরা যাতে আক্রমণ করতে না পারে তার জন্য রঘুনাথ সিং এর বাড়ি আসার রাস্তায় বড় বড় কাঠ পুঁতে দেওয়া হল। দু মাস অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও রঘুনাথ সিং যখন ঘাটশিলায় ইংরেজ শিবিরে গেলেন না তখন ফার্গুসন রঘুনাথ সিং কে বন্দী করার জন্য এক গাড়ি ফৌজ পাঠালেন। বিদেশী ফৌজ ঘাঁটিডুবার বুড়ি বাঁধের ধারে তাদের শিবির স্থাপন করে। শত্রুপক্ষের আগমনের সংবাদ পেয়ে রঘুনাথ সিং তাঁর বিশ্বস্ত সঙ্গীদের সাথে জঙ্গলে আস্তানা বেঁধে শত্রুদের হত্যা করার জন্য ওৎ পেতে থাকলেন। ব্রিটিশ ফৌজ রঘুনাথ সিং এর বাড়ী আক্রমণ করতে এগিয়ে এলে তিনি যোগ্য জবাব দেন ব্রিটিশরা যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে ঘাঁটিডুবার শিবিরে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।নিজেদের শিবির রক্ষা করাই ব্রিটিশদের দায় হয়ে দাঁড়াল। কিছু বন্দুকধারী ফৌজকে বুড়ীবাঁধের পাড়ে টহল দিতে বলা হয়। এদিকে রঘুনাথ সিং পাশের একটি বটগাছে লুকিয়ে থেকে বুড়ীবাঁধের পাড়ে টহলরত বন্দুকধারী ফৌজকে এক এক তীরে ধরাশায়ী করতে লাগলেন, কিছু বোঝার আগেই শন্ শন্ ক রে তীর এসে বুকে বিদ্ধ হয়ে যাচ্ছিল। বুড়ীবাঁধের পাড় থেকে সাদা চামড়ার সাহেবদের লাল রক্ত গড়িয়ে নেমে পুকুরের জলকে রক্ত বর্ণ করে দিল। ব্রিটিশ ফৌজের দেশী লাঠিয়ালরা সবকিছু বুঝতে পেরে পালাতে শুরু করল। শিবির থেকে সমস্ত ফৌজ পুকুর পাড়ে বেরিয়ে পড়ল এবং একে অপরকে জিঞ্জাসা করতে লাগল - এসব কে করছে ? রঘুনাথ সিং এর অব্যর্থ তীর তখনো সমানভাবে ছুটে আসছে এবং এক এক ফিরিঙ্গী "হায় গড" বলতে বলতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে। ইতিমধ্যে রঘুনাথ সিং এর বাহিনীর লোকেরাও কাছে এসে চারদিক থেকে ব্রিটিশ ফৌজকে ঘিরে ফেলে। এই লড়াইয়ে রঘুনাথ সিং এর একজন বল্লমধারী মারা যান। ফার্গুসনের ভাগ্নে বিদ্রোহীদের বর্শার আঘাতে প্রাণ দিলেন। ইতিমধ্যে বিদিশী ফৌজদের নিজেদের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়ে যায় এবং তারা শিবির ছেড়ে পালিয়ে যেতে শুরু করে। রঘুনাথ সিং তাঁর সঙ্গী সাথীদের সাথে এসে "পড়ে ডেরা "নামক জায়গায় ব্রিটিশ ফৌজকে পুনরায় ঘিরে ফেলেন এবং ধরে ধরে তাদের কেটে কেটে নদীর জলে ভাসিয়ে দিয়ে থাকেন। ফর্সা লোকেদের মানভুঞা ভাষায় বলা হয় "পেঁড়কা"। এই কারনে ফর্সা লোকেদের কাটা হয়েছিল বলে ঐ এলাকার নাম হয় - "পেঁড়েডেরা"। আর ব্রিটিশদের মুণ্ডুকাটা জায়গাটির নাম হয় - "মুড়াকাটা"। এই যুদ্ধে ফার্গুসনের বাহিনী সম্পূর্নভাবে রঘুনাথ সিং এর কাছে পরাজিত হয়ে যায়। প্রতিশোধ নেবার জন্য ফার্গুসন বার বার অভিযান পাঠিয়েও রঘুনাথ সিংকে কাবু করতে পারে নি। অথচ সারা সিংভূম এবং ধলভূমে ব্রিটিশপ্রভাবকে অক্ষুন্ন রাখার স্বার্থে রঘুনাথ সিংকে পরাজিত করে বন্দী করাটা ছিল অত্যন্ত জ রুরী। ফার্গুসন এবার নুতন ফন্দি আঁটলেন। যুদ্ধের পথ ছেড়ে দিয়ে দেশী ফৌজদের সাহায্য নিয়ে রঘুনাথ সিং এর কুটুম্ব-বন্ধু এবং তাঁর শত্রুদের বেড়াদার শিবিরে আনলেন। গোবরঘুটির তৎকালীন জমিদার তরণী সিং ছিলেন রঘুনাথ সিং এর মামা। ফার্গুসন গোবরঘুটি থেকে তাঁকেও বেড়াদাতে আনিয়ে তাঁর সাথে বন্ধুত্ব করলেন। তরণী সিং যদি তাঁর ভাগ্নে রঘুনাথ সিং এর গোপন ডেরার সন্ধান দেন এবং রঘুনাথ সিংকে ফার্গুসনের কাছে কৌশলে হাজির করেন তা হলে তরণী সিংকে আর কোনদিন কীন খাজনা দিতে হবে না, আর তা না করলে তার জমিদারী বাজেয়াপ্ত করে নেওয়া হবে। তরণী সিং ফার্গুসনের প্রস্তাবে রাজী হ য়ে যান। বিশ্বাসঘাতক তরণী সিং দামপাড়া গিয়ে জমিদার রঘুনাথ সিং এর বাড়ী গিয়ে তার দিদি এবং ভাগ্নে রঘুনাথ সিংকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে গোবরঘুটি নিয়ে যান। ফার্গুসন খবর পাওয়া মাত্র সেই রাতেই গোবরঘুটির জমিদার বাড়ী ঘেরাও করে রঘুনাথ সিংকে বন্দী করেন।অনেকের মতে রঘুনাথ সিং তখন ঘুমাচ্ছিলেন। তাঁর বুকের উপর টাড়া দিয়ে তাঁকে ধরা হয়। তাঁর গ্রেপ্তারের করুন কাহিনী গানের আকারে এখনো গোবরঘুটি এবং দামপাড়ার মানুষের মুখে মুখে ঘোরে।
"বড় ভেদে গো/নয়ন সিং এর বুকে দিল টাড়া।
দু - নয়নে বহে ধারা"।
যাইহোক রঘুনাথ সিং এবং তার মাকে বন্দী করে নিয়ে আসা হল ব্রিটিশ ঘাঁটি বেড়াদায়। ঘরের মধ্যে সাতদিন বন্ধ করে রঘুনাথ সিংকে প্রচণ্ড মার দেওয়া হল। তথাপি তিনি দাসত্ব স্বীকার করলেন না। অবশেষে তাঁকে টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে জিঙ্গাসা করা হল - "নয়ন সিং তোমার এখন কেমন লাগছে"।রঘুনাথ সিং সদর্পে উত্তর দিয়েছিলেন - " এটা আমার রোজকার কুস্তির মতন ফার্গুসন,এতে আমার কিছু হবার নয় "। এরপর রঘুনাথ সিংকে খাবার এবং জল দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হল এবং চারটি মহিষের দ্বারা তাঁকে টানানো হল। নয়ন সিং প্রাণ ত্যাগ করলেন তবুও বিদেশী গোলামী স্বীকার করলেন না। নয়ন সিং এর মাকে ছেড়ে দেওয়া হল। বিদেশী ফৌজের দল ততদিনে নয়ন সিং এর বাড়ি এবং শিবমন্দিরে আগুন লাগিয়ে দিয়ে সবকিছুকে অপবিত্র করে দিয়েছে। বুড়িমা ফিরে এসে আর ঘর দেখতে পেলেন না। রঘুনাথ সিনফ একদিন প্রতিজ্ঞা করেছিলেন -" জন্মভূমিকে বাঁচানো মানে মাকে বাঁচানো -- মাকে বিক্রী করে কেউ সুখী হতে পারে না "--- নিজের জীবন দিয়ে তিনি তাঁর প্রতিজ্ঞা পূরণ করে গেলেন।
শহীদ দুর্জন সিং অল অনল আখড়া,ঘড়াপুতা,রাইপুর,বাঁকুড়া থেকে তাঁর পূণ্য জন্ম তিথিতে শতকোটি প্রণাম জানাই। বীর শহীদ রঘুনাথ সিং অমর রহে।।চূয়াড় বিদ্রীহের মহানায়ক শহীদ বীর রঘুনাথ সিং অমর রহে।।রঘুনাথ সিং জিয়াদগে,জিয়াদগে।।অতে হাসা আবুআ,আবুআ।। বুরু বিনিন আবুআ,আবুআ।। বিদ দিরি জিয়াদগে,জিয়াদগে।।
April 22, 2020
MANOJ MURMU
No comments

#চাকুরিজীবী #সানতাড়রা #অ-#আদিবাসীদের #সাথে #বিবাহবন্ধনে #আবদ্ধ #হয়ে #নিজেদের #জীবনে #কি #সর্বনাশ #ডেকে #এনেছেন# #দেখে #নেওয়া #যাক#
যেহেতু অ-আদিবাসী মেয়ে বা ছেলেরা আদিবাসী সান্তাড় সমাজ, সংস্কৃতি, রীতিনীতি ও পরিবার কে ভালোবাসে না সেইজন্য আদিবাসী সান্তাড়দের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর চাকুরিজীবী সান্তাড়দের কে তাদের পরিবার, সমাজ ও আত্মীয়স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন করতে সম্পূর্ণভাবে নিজেদের কে অ-আদিবাসী পরিবারেরা বাধ্য করায়। তাহলে এদের জীবনের সুখ, দুঃখ, বেদনা, ভালো- মন্দ একমাত্র অ-আদিবাসী পরিবারের হাতে। বাক স্বাধীনতা বলতে এদের কিছুই থাকবে না। এরপর অ-আদিবাসী পরিবারেরা আদিবাসী সান্তাড় দের পরিচিত বা তকমা ঘোচাতে সান্তাড় দের পদবী পরিবর্তন করে তাদের দাস, চ্যাটার্জি, ব্যানার্জি, মুখার্জি, চক্রবর্তী ইত্যাদি পদবী তে পরিবর্তন করবেন। ফলে আদিবাসী চাকুরিজীবী সান্তাড়রা অ-আদিবাসী পরিবারের কাছে চিরকালের জন্য তাদের আত্ম পরিচিতি হারিয়ে ফেলবে। তাদের আত্ম পরিচিতি হারানোর ফলে তারা নামহীন, গন্ধ হীন, গোত্র হীন ফুলের মত আজীবন বেঁচে থাকবে। এরপর আদিবাসী সান্তাড়দের প্রবহমান রক্তের স্রোত অ-আদিবাসীদের শরীরে আর প্রবাহিত হবে না। ফলে তাদের সন্তান সন্ততি রা আর আদিবাসী সান্তাড়দের রক্ত বহন করে বেঁচে থাকবে না। যে রকম "কাকের বাসায় কোকিল ডিম পাড়লে সেই বাচ্চা আর কাক হয়ে জন্মায় না, কোকিল হয়েই জন্মায়।" ফলে তাদের প্রজন্মের শরীরে আর আদিবাসী সান্তাড়দের রক্ত প্রবাহিত হবে না। তাদের প্রজন্মের গায়ে আর আদিবাসী সান্তাড়দের গন্ধ থাকবে না,তাদের প্রজন্মের গায়ে আর আদিবাসী সান্তাড়দের পরিচিত নিয়ে বেঁচে থাকবে না, তাদের প্রজন্ম রা বেঁচে থাকবে অ-আদিবাসী পরিচিত নিয়ে। অথচ আদিবাসীদের ST রিজার্ভেশন এর সমস্ত রকমের সুযোগ সুবিধা বঙশ পরম্পরায় ভোগ করবে। সুতরাং তারা অ-আদিবাসীদের বুদ্ধিদীপ্ত বহ্নি শিখার কাছে নিজেদের কে নিঃশেষ করলেন। না তাদের প্রজন্মের কাছে নিজেদের পরিচিত বেঁচে থাকল? না তাদের পরিবারের কাছে নিজেদের পরিচিত বেঁচে থাকল? না তাদের সমাজের কাছে তাদের পরিচিত বেঁচে থাকল? তাহলে অ-আদিবাসীরা চাকুরিজীবী সান্তাড়দের কে সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করে নিজেরা বিত্তশালী হলো আর চাকুরিজীবী সান্তাড়রা নিজেদের জীবনকে অ-আদিবাসীদের কাছে সঁপে দিয়ে বোকা কালীদাস এর মত মহান হতে গিয়ে নিজেদের জীবনে কি সর্বনাশ ডেকে এনেছেন তা একমাত্র তারাই হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন।
#চাকুরিজীবী #সানতাড়রা #অ-#আদিবাসীদের #সাথে #বিবাহবন্ধনে #আবদ্ধ #হয়ে #নিজেদের #পরিবারের #প্রতি #কি #সর্বনাশ #ডেকে #এনেছেন #দেখে #নেওয়া #যাক#
চাকুরিজীবী সান্তাড়রা অ-আদিবাসীদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর থেকে নিজের পরিবারের সাথে তাদের সম্পর্ক যেন উত্তর মেরু, দক্ষিন মেরু, এই দুই বিপরীত মুখী মেরুর অবস্থানের মতো। যে গরীব বাবা মায়েরা একদা নিজেরা অভুক্ত থেকে সন্তানকে লালন পালন করে বড় করলেন। তারাও ত একদিন কুঁড়ে ঘরে থেকে স্বপ্ন দেখেছিলেন আমাদের ছেলে মেয়েরা বড় হলে তাদের স্বপ্ন সত্যি হবে। এই আশায় বুক বেঁধে বাবা মায়েরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে ছেলে মেয়েদের কোলে পিঠে করে মানুষ করেছিলেন। কিন্তু বাবা মায়েদের স্বপ্ন যখন সত্যি হলো তখন তাদের পাশে আর ছেলে মেয়েরা নেই। তাদের ছেলে মেয়েরা ত নতুন বাবা মায়েদের খুঁজে পেয়েছে। নতুন বাবা মায়েদের আদর যত্নের কাছে তাদের জন্মদাতা বাবা মা কে ভুলে গেছে সবাই। তাদের বাবা মায়ের চোখের জল মোছার জন্য তাদের পাশে কেউ নেই, তাদের কে স্বান্তনা দেওয়ার মতো তাদের পাশে কেউ নেই। তবুও সব দুঃখ কে হাসি মুখে তাদের বাবা মায়েরা বরণ করে নিয়েছেন। বাবা মা হয়ে নিজেদের সন্তান কে কোন মুখে অভিশাপ দেবেন? সেইজন্য সব বাবা মায়েরাই শত দুঃখের মাঝে তাদের মুখে শোনা যায় " আমাদের সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে"। সেইজন্য তাদের বাবা মায়েরা তাদের ছেলেদের মুখ দর্শন এর জন্য অনেক বাবা মা তাদের আছে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের ছেলেরা তাদের অ-আদিবাসী শশুর শাশুড়ির কাছে তাদের জন্মদাতা বাবা মা অস্বীকার করেছেন এবং তাদের অ-আদিবাসী শশুর শাশুড়ির কাছে তাদের জন্মদাতা বাবা মা কে চাকর বলে পরিচিত দিয়েছেন। এহেন পরিস্থিতিতে তাদের ছেলের শশুর শাশুড়ির বাড়ীর পর্দার আড়ালে তাদের মায়ের আপ্তবাক্য " বাবু তুই যখন
প্রথম বার আমাকে মা বলে ডেকে ছিলি তখন আমার মনেপ্রাণে কি নাই আনন্দ হয়েছিল, আজ তুই যখন আমাদের কে চাকর বলে পরিচিত দিলি আজকেও তোর মুখ থেকে এই ডাক শুনে ততটাই আমার মনেপ্রাণে আনন্দ হলো"। এইভাবে তাদের জন্মদাতা দের কাছ থেকে সবাই দূরত্ব বজায় রেখে চলেছেন।
#চাকুরিজীবী #সানতাড়রা #অ-#আদিবাসীদের #সাথে #বিবাহবন্ধনে #আবদ্ধ #হয়ে #নিজেদের #সমাজের #প্রতি #কি #সর্বনাশ #ডেকে #এনেছেন #দেখে #নেওয়া #যাক#
শিক্ষাই হল যেকোন সমাজ বা জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষাই আনে চেতনা, শিক্ষাই আনে বিপ্লব। শিক্ষা ছাড়া কোন সমাজ বা জাতি এগিয়ে যেতে পারে না। আজ আমাদের শিক্ষিত চাকুরিজীবী সান্তাড় রাই হলো সমাজের অগ্রগতির ধারক ও বাহক। অথচ তারাই আমাদের সমাজ থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছেন। আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি, রীতিনীতি ও ভাষাকে বিশ্ব দরবারে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব যাদের কাঁধে তারাই আজ আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি, রীতিনীতি ও ভাষাকে অবহেলা, অবমাননা করছেন। তাহলে আজ শিক্ষিত চাকুরিজীবী সান্তাড় রাই সমাজ কে পিছিয়েছেন। আজ শিক্ষিত চাকুরিজীবী সান্তাড় রাই সমাজ কে ডুবিয়েছেন। আজ শিক্ষিত চাকুরিজীবী সান্তাড় রাই সমাজ কে অবমাননা করেছেন। আজ শিক্ষিত চাকুরিজীবী সান্তাড় রাই সমাজ কে পদাঘাত করেছেন। আজ শিক্ষিত চাকুরিজীবী সান্তাড় রাই ঘরের শত্রু বিভীষণ এর অবতারে অবতীর্ণ হয়েছেন। তাই এরাই সমাজের বারোটা বাজাচ্ছেন।
তাহলে চাকুরিজীবী সান্ত্বাড় রা অ-আদিবাসীদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে নিজের জীবনে সর্বনাশ ত ডেকে আনলেন তার সাথে সাথে নিজের সমাজ ও পরিবারের কেও ডুবালেন। তাই নিজের সমাজকে বাদ দিয়ে, নিজের পরিবারকে বাদ দিয়ে, নিজের আত্মীয় স্বজনদের বাদ দিয়ে আপনাদের জীবনের চলার পথ কোনদিনও সুখের হবে না। এদের কে বাদ দিয়ে যদি আপনারা সুখের স্বর্গে বিরাজ করতে চান তবে আপনার সমাজ, আপনার পরিবার, আপনাদের আত্মীয়স্বজন কোনদিনও ক্ষমা করবে না এবং অ-আদিবাসীদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করতে গিয়ে আপনাদের, সমাজের, পরিবারের কি অপূরণীয় ক্ষতি করেছেন সেটা কোনদিনই আপনারা পূরণ করতে পারবেন না।]
Tuesday, April 21, 2020
April 21, 2020
MANOJ MURMU
No comments
তিনি ‘টটকো মলং’, তিনি ‘পাতাং সুরাই’, তিনিই সাঁওতাল সাহিত্যের অন্যতম উজ্জ্বল ‘ইপিল’। সাঁওতাল ভাষার স্বতন্ত্র লিপি তাঁর আঙুলের ছোঁয়ায় অমর হয়েছে। কবির জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করলেন নচিকেতা বন্দ্যোপাধ্যায়
সারদাপ্রসাদ। ছবি: লেখক
সাঁওতালি অতি প্রাচীন ভাষা। দীর্ঘ জীবন ধরে মূলত মৌখিক সাহিত্যই এই ভাষাকে ধরে রেখেছে। এর সঙ্গে সংরক্ষিত হয়েছে সাঁওতালদের জাতি গোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও পুরাণতত্ত্ব। এই আদিম আদিবাসীদের বৌদ্ধিক সংস্কৃতি ও প্রাত্যহিক যাপন আর্য সভ্যতার নিকট তেমন ঋণী নয়। কৃষি ও শিল্পে ওঁদের নিজস্ব রীতি প্রাচীন ও বহমান। তাঁদের ইতিহাস, প্রাক আর্যযুগের ইতিহাস। তাঁদের ভাষাও তাঁদেরই মতো প্রাচীন।
সাঁওতালি সাহিত্য আদিযুগের শ্রুতি সাহিত্য। সুপ্রাচীন এই লোকসাহিত্যের কাল নির্ধারণ কার্যত অসম্ভব। ইতিহাসের মধ্যযুগেও এই শ্রুতি সাহিত্যই সাঁওতালদের সংস্কৃতির মাধ্যম ছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে আসার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ভারতে মিশনারিদের আগমন হয়। উদ্দেশ্য, খ্রিস্টান ধর্মের প্রচার। বাংলা, বিহার, ওড়িশার সাঁওতাল অধ্যুষিত এলাকায় আদিবাসীদের ধর্মান্তরের কর্মসূচি উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ থেকেই শুরু হয়ে যায়। সাঁওতাল ভাষার সম্পদ অন্বেষণ তন্নিষ্ঠ হয়। মিশনারিরা ভাষাটির চর্চা, যত্ন ও উন্নয়নে সচেষ্ট হন। মিশনারিদের অবদান—এ ভাষার লিখিত রূপ। রোমান লিপিতে সাঁওতাল ভাষার প্রথম মুদ্রণ এই সময়েই। এ ভাষাও সাহিত্যের ‘মধ্যযুগ’ সূচনা করে। আধুনিক কাল সেদিনের। মিশনারি প্রভাবমুক্ত হওয়া বিংশ শতাব্দীর তিরিশ দশকে। সাধু রামচাঁদ মুর্মু, পণ্ডিত রঘুনাথ মুর্মু, মঙ্গলচন্দ্র সরেন প্রমুখ সে দশকের প্রতিনিধি।
কবি সারদাপ্রসাদ কিস্কু সাঁওতালি ভাষায় পদ্য লিখতেন। জন্ম দাঁড়িকাডোবা, পুরুলিয়ার বান্দোয়ান সন্নিহিত গ্রাম। ১৯২৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি। পিতা চরণ কিস্কু। মা ধনমণি। কবির বেড়ে ওঠা প্রান্তিকতা ও দারিদ্রের পটভূমিতে। অনুশীলনে সততা ও দৃঢ় সংকল্প। জেরোবারি গ্রামে নিম্ন প্রাথমিক, বড়গড়িয়া গ্রামে উচ্চ প্রাথমিক, রানিবাঁধ মিডল স্কুল (এখানেই মেরিট স্কলারশিপ প্রাপ্তি) ও খাতড়া হাইস্কুলে ছাত্রজীবন। ১৯৪৮ এ প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ। রামানন্দ কলেজে (বিষ্ণুপুর) ভর্তি হয়েছিলেন আই এ পড়বেন বলে। কিন্তু দারিদ্র অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। আটকে যায় উচ্চশিক্ষা।
এর পরে জীবনযাপন এবং জীবিকার জন্য তিন মাসের ‘হিন্দি শিক্ষন’। প্রশিক্ষণ নেন বান্দোয়ানে ১৯৫০ সালে। তার পরে সুযোগ পেলেন জামতোড়িয়া সিনিয়র বেসিক স্কুলে শিক্ষকতার। ১৯৬২ সালে বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, পরাজয় এবং চাকরি হারানো। পুনরায় চাকরি জীবন শুরু বড়দিহি প্রাথমিক স্কুলে। একেবারে ১৯৮৯ সালে অবসর গ্রহণ পর্যন্ত তিনি সেখানেই কর্মরত ছিলেন। রাষ্ট্রপতির পুরস্কার প্রাপ্তি ১৯৭৩ সালে।
জীবন তাঁর মসৃণ ছিল না। বন্ধুর পথে সাহিত্যই তাঁর সখা। তিনি আদ্যন্ত কবি ও কথা সাহিত্যিক। পদ্য রচনার হাতেখড়ি ছাত্রজীবনে। অনুপ্রেরণায় কবি সাধু রামচাঁদ মুর্মুর ‘সৌরি ধরম সেরেঞ পুঁথি’। ছন্দমিলে সারদাপ্রসাদের আসক্তি বরাবরের। প্রথম লেখা প্রকাশ ‘হড় সম্বাদ’ পত্রিকায়। ‘টটকো মলং’ (অর্থ, উঁচু কপালধারী) ছদ্মনামে লিখতেন গল্প। ‘তেতরে’ পত্রিকায় লিখতেন ‘পাতাং সুরাই’ (অর্থ, পাতার পোকা) ছদ্মনামে। স্বঘোষণায় সাধু রামচাঁদ তাঁর গুরু। রামচাঁদ ছিলেন প্রতিবাদী কবি। সাঁওতালদের ‘সারি ধরম’ (শাশ্বত ধর্ম) জাগরণের কবি। ‘দেবন তিঙ্গুন আদিবাসী বীর’ তাঁর জাগানিয়া গান সাঁওতাল মানসে যেন জাতীয় মন্ত্র। মাতৃভাষাই যে শিক্ষার বাহন, সেটা তিনি বুঝতেন। তাই ১৯২৩ সালে তৈরি করেছিলেন সাঁওতাল ভাষার স্বতন্ত্র লিপি। ‘মঁজ দাঁদের আঁক’। এ লিপিতেই তাঁর অধিকাংশ রচনা। ‘অলচিকি’ অপেক্ষা এই লিপি প্রাচীনতর। তিনি কবি ও দার্শনিক, শিল্পী ও সংস্কারক। সারদাপ্রসাদের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ভুরকৌ ইপিল’ (১৯৫৩)। সাঁওতাল ভাষায় ‘ইপিল’ কথার অর্থ ‘নক্ষত্র’। ‘ভুরকৌ ইপিল’ অর্থাৎ, শুকতারা। এই বইয়ে গানও লিপিবদ্ধ হয়েছে।
ক্রমান্বয়ে ‘কুহূবউ’ (অর্থ, কোকিল), ‘গাম গঁদার’ (অর্থ, মধুর বাণী) (১৯৬৭), ‘লাহা হররে’ (অর্থ, এগিয়ে চলার পথে) (১৯৮৫) গান ও কবিতা সংকলনগুলো প্রকাশিত হয়। এগুলো প্রধান। আরও আছে। সমালোচকদের মতে, তাঁর কবিতার তিনটি ধারা। অন্তর্মুখিতা, কল্পনাশ্রয় ও ‘মিস্টিক ভাবনা’ নিয়ে প্রথম ধারা। দ্বিতীয় ধারায় প্রকৃতি পর্যায়। অন্তিম ধারায় জীবন ঘনিষ্ঠতা। আদিবাসী জীবনের যন্ত্রণা, শোক, আশা এবং আকাঙ্ক্ষা। তিনি পঞ্চাশের দশকের কবি। সবে ভারত স্বাধীন হয়েছে। স্বদেশি আন্দোলন দেখেছেন কাছ থেকে। তাই সাহিত্যে যতটা নিবেদিত, ততটাই নিবেদিত সমাজচেতনা ও সামাজিক সংস্কারে। এই দশকেই বিহার, বাংলা ও ওড়িশার সাঁওতালি সাহিত্যের নবজাগরণ। নারায়ণ সরেন, ডমন সাহু ‘সমীর’, আদিত্য মিত্র ‘সান্থালি’ প্রমুখ কবি পুনর্প্রতিষ্ঠিত।
তিনি কথা সাহিত্যিকও বটে। ‘সলম লটম’ (অর্থ, তালগোল) প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ সালে গল্প সংকলনরুপে। ‘জুডৌসি অণল মালা’ (অর্থ, মনোরম প্রবন্ধ সংগ্রহ) (১৯৯৪) একমাত্র প্রবন্ধ সংকলন। গানে-কবিতায়-গল্পে দেশ ও সমাজের কথা বলেছেন। সাহিত্যে সাঁওতালি যাপন শেষকথা নয়, শেষকথা মানবতা। ইতিহাস বোধে, সাহিত্য বোধে, সংস্কৃতি বোধে দেশ ও কালের ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন। তিনি মানুষের কবি। তিনি নক্ষত্র। তিনি ইপিল।
সাঁওতাল বিদ্রোহ, খেরোয়ালি আন্দোলন, ছোটনাগপুর উন্নতি সমাজ, আদিবাসী মহাসভা প্রভৃতির ইতিহাস তাঁর জানা। তিনি জানতেন অস্ট্রো-এশিয়াটিক গোষ্ঠীর মধ্যে সাঁওতাল সম্প্রদায়ই সংখ্যাগরিষ্ঠ। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানসিক সুসংবদ্ধতার মাপকাঠিতে তারাই শীর্ষে। তবু বহমান সমাজে কখনও কখনও কুসংস্কার আসে। তাই সমাজ সংস্কারক তিনি ডাইনি-বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। বিরুদ্ধতা এসেছে ফলশ্রুতিতে। জীবনে বিপন্নতা ও ঝুঁকি এসেছে। অটল সারদাপ্রসাদ জানতেন সততা ছাড়া কবির আশ্রয় নেই। ১৯৯৬ সালের ১৮ মার্চ কবির জীবনাবসান ঘটে। রেখে যান সাহিত্যকীর্তি, পাঠক ও পরবর্তী প্রজন্মের অনুপ্রেরণা।
লেখক সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মসচিব
April 21, 2020
MANOJ MURMU
No comments

এক বৃদ্ধ পিতা তার আদরিনী কন্যার বিবাহের পর স্নেহের টানে মেয়ের বাড়ি চলে এসেছেন তার মেয়ে জামাই কি রকম আছে তা দেখতে। অভাব অনটনের সংসারেও মেয়ে বাবাকে পেয়ে অসীম চঞ্চল হয়ে উঠল। সাঁওতাল সমাজে চিরাচরিত প্রথা অনুসারে অতিথি এলে যেমন এক ঘটি জল শুভ অতিথির পায়ের কাছে রেখে দিতে হয় অভ্যর্থনার জন্য।
মেয়েও তাই করলেন বাবার সমামন ,আর ভূমি পিষ্ট হয়ে প্রণাম করলো। তারপর মেয়ে বাবা তুমি বিশ্রাম করো বলেই বাইরে বেরিয়ে গেল। পিতা অনুমান করলেন দারিদ্র্যের সংসারে আত্মীয়তার জন্য মেয়ে নিশ্চয়ই কোনো কিছু ধার করতে বেরিয়েছে। ভাবতে ভাবতে বেদনায় কাতর হয়ে উঠলেন তিনি এবং এমন সময় বাইরে কোলাহলে বৃদ্ধ এসে দেখেন সেই পাড়ায় আগুন লেগেছে।
আর একটার পর একটা ঘর পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। সমস্ত লোক একত্রে হয়েও কুয়ো ঝর্না ডাডির জল দিয়ে নেভাতে পাচ্ছে না সেই আগুন। বৃদ্ধ ভুলে গেলেন মেয়ের দেওয়া ঘটির জলে হাত পা ধুতে ও আচমন করতে - যা অবশ্যই করণীয় অতিথি হিসেবে। কারণ তা আতিথ্য স্বীকারের প্রতীক। তিনি সেই ঘটির জলই দিশাহারা হয়ে আগুনের লেলিহান শিখায় ছিটিয়ে দিলেন।আর বিস্ময়ের সঙ্গে মানুষ দেখল মুহূর্তেই আগুন নির্বাপিত হয়েছে।
সমবেত ক্লান্ত জনতা সমস্বরে বলে, আপনি নিশ্চয়ই মন্ত্রপূত বারি ব্যবহার করেছেন। বৃদ্ধ বললেন না এ হল আমার আদরিনী কন্যার হৃদয় উৎসারিত করা ভালোবাসা দেওয়া অতিথি গ্রহণের লটা দাঃ ( ঘটি জল)। অতিথিকে দেবতা মনে করে আমার নির্দ্বিধায় তাকে গ্রহণের জন্য যে পূর্ণ ঘটির জল দিয়ে অভ্যর্থনা করি তা এত বিশুদ্ধ পবিত্র ও শক্তিশালী - আমি তা নিজেই জানতাম না। যাইহোক অতিথি হিসেবে তোমার ঘরে কেউ এলে তাকে লটা দাঃ দিয়ে অভর্থনা করবে। এই লটা দাঃ এর কথা কখনোই ভুলবে না।
April 21, 2020
MANOJ MURMU
No comments
তরতাজা এক যুবকের নাম নরেন হাঁসদা। অনাথ ও গরিব আদিবাসী শিশুদের একটা আবাসিক স্কুল চালান। পুরুলিয়া শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে আর্শা ব্লকে ভালডুংরি নামে একটা স্বপ্ন-পাহাড়ের নীচে সে স্কুল। আবাসিকের সংখ্যা এইমুহূর্তে ২৮ জন। আশপাশের গ্রামগুলো থেকে আরও ২০০ বাচ্চা আসে ওর স্কুলে। নরেন রাজ্যের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ছুটে বেড়ান কণ্ঠে ঝুমুর গান নিয়ে, শিশুগুলোর অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা— একটু সোনালির জন্য। এছাড়া মাঝেমধ্যে এদিক ওদিক থেকে জুটে যায় কিছু দরদী মানুষের সহায়তা, এভাবেই চলে। আমি ও আমাদের আবৃত্তির দল কবিতাবাড়ি কিছুদিন আগে ওদের কাছে গিয়েছিলাম এরকম আশ্চর্য উদ্যোগের স্পর্শ নিতে। ওদের কাছে সাধ্যমত কিছু পৌঁছে দিয়েছি।
সে আর কতটুকুই বা। এই করোনার আবহে নরেন শিশুগুলোকে নিয়ে খুব সংকটে! খাবার ফুরিয়ে আসছে দ্রুত। নরেন গান গাইতেও যেতে পারছেন না কোথাও। কীভাবে অনাথ শিশুগুলোকে বাঁচিয়ে রাখবে ওঁ!
বন্ধুরা ওদের একটু সাহায্য করুন। নরেনের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট দিলাম। দু-একশ করে টাকা আমরা অনেকেই দিতে পারি! ওটুকুই বিন্দু বিন্দু করে যুক্ত হলে বাঁচবে অনেকগুলো প্রাণ।
PURULIA DHARTI MARSHAL SOCIETY
Bank : SBI Purulia
A/c No. : 37328725490
IFSC : SBIN0000160
Bank : SBI Purulia
A/c No. : 37328725490
IFSC : SBIN0000160






April 21, 2020
MANOJ MURMU
No comments

ডা.তিলক পুরকায়স্থ
জ্যৈষ্ঠ মাসের কাঠফাটা গরমে চলেছি ধামসা মাদলের খোঁজে- বাঁকুড়া জেলার সাঁওতাল আদিবাসী অধ্যুষিত বাঁশকানালি গ্রামে। এখানে বুদ্ধ পূর্ণিমার পরের পূর্ণিমায় প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় “বাহা- মা: মড়ে অনুষ্ঠান” । আমার এই যাত্রার উদ্দেশ্য আমার দেশ, আমার বাংলা, আমার ভারতবর্ষের দর্শন ।
সাঁওতাল উপজাতিদের নিয়ে কিছু বলা যাক।এরা বিশ্বাস করে এদেরই পূর্বপুরুষ ছিলেন একলব্য, যাঁকে অত্যন্ত অন্যায় ভাবে দ্রোণাচার্য তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুল গুরুদক্ষিণা হিসাবে চেয়েছিলেন। তাই জানেন কিনা জানিনা, আজকেও সাঁওতালরা তীর ছোড়ার সময় বুড়ো আঙুল ব্যবহার করে না। অবশ্য এরকম অন্যায় কাজের উদাহরণ তো আমাদের দেশে ভুরি ভুরি ঘটেছে- শত শত একলব্য, শম্বুকদের কথা আর কেই বা মনে রাখে !সাঁওতালরা কিসকু, মুর্মু, হাঁসদা, সরেন, টুডু,মানডি, বাস্কে এই সাতটি গোষ্ঠী বা গোত্রে বিভক্ত।
সাঁওতাল নামে এঁদের পরিচিতি পরে হয়েছে, আদিতে সাঁওতাল, মুন্ডা, কোল, মাহালি সবাই এরা পরিচিত ছিল খেরওয়াল গোষ্ঠী হিসাবে। পরে অনেক ছোট ছোট গোষ্ঠী খেরওয়াল গোষ্ঠী থেকে বেরিয়ে গিয়ে নিজেদের স্বতন্ত্র গোষ্ঠী গড়ে তোলে, অনেকে হিন্দুও হয়ে যান। যেমন শুধু ঝাড় খণ্ডের কথাই যদি ধরি তাহলে দেখতে পাচ্ছি সাঁওতাল ছাড়াও ঝাড়খণ্ডে সর্বমোট ৩২ টি জন জাতির বাস। এদের মধ্যে পুরোপুরি কৃষিজীবী জন জাতি হচ্ছে সাঁওতাল, মুন্ডা, হো,ওঁরাও , খারিয়া, ভূমিজ ইত্যাদি। পক্ষান্তরে বিরহর, পাহাড়ি খারিয়া ইত্যাদি জাতির আদিতে শিকার করাই ছিল মুখ্য জীবিকা। শিল্প এবং দৈনন্দিন ব্যাবহারের সামগ্রী তৈরি করত মালহার, লোহার, কারমালি, অসুর ইত্যাদি জনজাতি। পাহাড়িয়া জনজাতির লোকেরা ঘুরে ঘুরে কৃষিকাজ করতেন।
সাঁওতাল উপজাতিদের বাহা- মা: মড়ে উৎসবে মেতে ওঠার আগে এবং কিছু বলার আগে রাঢ় বাংলা এবং বাঙালির নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের কিছু দরকার আছে বলে মনে হয়।আমরা বাঙালিরা গর্বিত আর্য জাতি, আমাদের নিয়ে কবি লেখেন-” মোক্ষ মুলার বলেছে আর্য,/ সেই থেকে মোরা ছেড়েছি কার্য।”
দেখেনি আমরা কতটা আর্য, আর যাঁদের আমরা অনার্য বলছি, তাঁদের নিয়েও কিছু আলোচনা করছি।আর্য জাতি তাঁদের ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে যখন ভারতে, ভালো করে বললে উত্তর ভারতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বা প্রতিষ্ঠা পাবার জন্য যুদ্ধ বিগ্রহে লিপ্ত আছে, বাংলাদেশে তখন আদিতম দ্রাবিড় গোষ্ঠী এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ আদিম জনজাতি গোষ্ঠী বা প্রটো অস্ট্রোলয়েড গোষ্ঠীর লোকেদেরই বসবাস। এরা ছিল অতি উন্নত জাতি, এরা অস্ট্রিক ভাষায় কথা বলত।
পরবর্তী কালে অবৈদিক আর্য যেমন আলপিও, দিনারিও ইত্যাদি জন গোষ্টিও বাংলার মাটিকে বাসভূমি হিসাবে গ্রহণ করে থিতু হয়ে বসে। এই দ্রাবিড় এবং মুখ্যত অবৈদিক আর্য আলেপিও , দিনারিও গোষ্ঠীর লোকেদের সঙ্গে অস্ট্রিক সংস্কৃতি ও সভ্যতার ধারক গোষ্ঠীর মিলনের ফলেই আজকের বাংলাদেশের বাঙালি গোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক উৎপত্তি। অর্থাৎ বাঙালি হচ্ছে মিশ্র শংকর জাতি।বৈদিক আর্যদের বঙ্গ বিজয় এবং বৈদিক সংস্কৃতির আবির্ভাব এর অনেক পরের ঘটনা।বঙ্গ সংস্কৃতিতে অনার্য প্রভাব নিয়ে বলা যায় যে নৃতাত্ত্বিক ভাবে বাঙালি যে উন্নত জাতি তার কারণ হচ্ছে, বাঙালির রক্তে আছে তিনটি সভ্যতার – প্রোট অস্ট্রোলয়েড, দ্রাবিড় এবং মিশ্র আর্যভাষী- সভ্যতার মিশ্রণ। তাই বঙ্গ সংস্কৃতি বলতে কেবল ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি আদৌ বোঝায় না। এর পরতে পরতে মিশে আছে আদিম জনজাতি, অবৈদিক সভ্যতার প্রভাব। এর সঙ্গে সংযুক্তি করন ঘটেছে বৌদ্ধ ও জৈন সংস্কৃতির প্রভাব। অর্থাৎ এই ভারতের মহামানবেরা হচ্ছেন আদিম যুগ থেকে বসবাসকারী অসংখ্য জাতি-উপজাতিরা।

টর্চের আলোয় আমগাছে মুরগি
তাই বিদেশি পন্ডিতেরা যখন বলেন বহিরাগত আর্যদের দ্বারা ভারতবর্ষের সু সভ্যতার প্রচলন ঘটেছে, এমন কি ভারতীয় ধর্ম চেতনা ও বৈদিক মন্ত্র সমূহ, বহিরাগত আর্যদের দান, তখন বোঝা যায়, এনাদের চেতনায় ছড়িয়ে আছে, ভারতীয়দের সম্মন্ধে এক তুচ্ছতাচ্ছিল্য মনোভাব। বাইরের সভ্যতার সংস্পর্শে এসেই ভারতীয়রা সভ্য হয়েছে। এর থেকে মিথ্যা মিথ আর হয়না- অতি উন্নত সিন্ধু সভ্যতার প্রচলন কারা করেছিল ? কোথায় ছিল তখন সভ্য আর্যরা ?
সুর- অসুর, আর্য-অনার্য ইত্যাদি শব্দগুলি নিয়ে চমৎকার নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করেছেন সুহৃদকুমার বাবু তাঁর আর্য রহস্য বইয়ে। তাঁর লেখা কয়েকটি লাইন তুলে ধরছি-” আমরা সকলেই জানি যে ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি আর কিছুই নয়, খুব কম হলেও চারটি মৌলিক ভাষা-গোষ্ঠীর মানুষের সমবায়ে গঠিত এক সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল। কাল অনুসারে তারা হল অস্ট্র-এশিয়াটিক কোল গোষ্ঠী দ্রাবিড়, ইন্দো- যুরোপীয় বেদিয়া শ্রেণী ও ভোটচিনীয়।। ম্যাক্স মুলরের সময় থেকে বিনা কারণে যাযাবর জাতিটি সহসা আর্য নামে অভিহিত হতে লাগল।ঐ যাযাবর জাতিটি ছাড়া অপর সকলেই ছিল স্থায়ী বসবাসকারী কৃষিনির্ভর জনগোষ্ঠী। আর যাযাবর বেদিয়ারা স্থায়ী বসবাসকারী মানুষের কাছে আসত ঔষধ বিক্রয় করতে, তুকতাক করতে আর সাধারণ মানুষের ভালোর জন্য দুর্বোধ্য সব জাদুমন্ত্রে ভগবানকে ডাকতে।…..”
সুর- অসুর, আর্য-অনার্য ইত্যাদি শব্দগুলি নিয়ে চমৎকার নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করেছেন সুহৃদকুমার বাবু তাঁর আর্য রহস্য বইয়ে। তাঁর লেখা কয়েকটি লাইন তুলে ধরছি-” আমরা সকলেই জানি যে ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি আর কিছুই নয়, খুব কম হলেও চারটি মৌলিক ভাষা-গোষ্ঠীর মানুষের সমবায়ে গঠিত এক সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল। কাল অনুসারে তারা হল অস্ট্র-এশিয়াটিক কোল গোষ্ঠী দ্রাবিড়, ইন্দো- যুরোপীয় বেদিয়া শ্রেণী ও ভোটচিনীয়।। ম্যাক্স মুলরের সময় থেকে বিনা কারণে যাযাবর জাতিটি সহসা আর্য নামে অভিহিত হতে লাগল।ঐ যাযাবর জাতিটি ছাড়া অপর সকলেই ছিল স্থায়ী বসবাসকারী কৃষিনির্ভর জনগোষ্ঠী। আর যাযাবর বেদিয়ারা স্থায়ী বসবাসকারী মানুষের কাছে আসত ঔষধ বিক্রয় করতে, তুকতাক করতে আর সাধারণ মানুষের ভালোর জন্য দুর্বোধ্য সব জাদুমন্ত্রে ভগবানকে ডাকতে।…..”
বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও সেই পরিবর্তন সমানে ঘটেছে। প্রোট অস্ট্রোলয়েড, দ্রাবিড় এবং মিশ্র আর্যভাষী- সভ্যতার মিশ্রনে খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীর আগেই তৈরি হয়েছে পূর্বমগধী জাত প্রাকৃত ভাষা। এর প্রমাণ পাওয়া যায় সপ্তম শতকে বঙ্গে আগত চৈনিক পর্যটক হিউএন সাংগের বর্ণনায়।আদি মানভূম, সাঁওতাল পরগনা, বাঁকুড়া ইত্যাদি স্থানের ( হিউএন সাংগের বর্ণনায় যে কজঙ্গল পাওয়া যায় তা কিন্তু একদিকে ছোট নাগপুরের মালভূমি, অন্য দিকে ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ, কেওনঝর এবং বালেশ্বর অবধি বিস্তৃত ছিল।)এখানকার ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সমতল নদীয়া এবং বর্তমানের কলকাতার ভাষা ও সংস্কৃতির থেকে বেশ কিছুটা আলাদাআরেকটা কথা- সাঁওতালরা প্রকৃতির উপাসক, মূর্তি পুজো করেনা।

নাইকির উঠোনে প্রথম রাতের গানের আসর
দুই
রাত প্রায় আটটা, আমরা এসে পৌঁছেছি , বাঁকুড়া জেলার সাঁওতাল আদিবাসী অধ্যুষিত বাঁশকানালি গ্রামে । এখানে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে বাহা- মা: মড়ে অনুষ্ঠান , পুরোহিত বা নায়কের বাড়ীতে। সিমলাপাল থেকে এই গ্রামের দূরত্ব ১০ কিমি র মতন।
আমরা উঠেছি, শ্রী মহেন্দ্রনাথ সরেন এই বাঁশকানালি গ্রামের মোড়লের বাড়িতে। এনার ছোটভাই ডাক্তার এবং আমার স্ত্রীর সহকর্মী। ডাক্তার ও সপরিবারে এসেছে। একগাড়ি পল্টন এসে তিনদিনের জন্য খুঁটি গেড়ে বসলাম, মোড়লের বাড়িতে। কিন্তু মোড়ল ই তো এই আনন্দ উৎসবের মুখ্য হোতা। আমাদের সামলাবে কে ? কুছ পরোয়া নেই, মোড়ল মশাইয়ের বৌদি, আমাদের সবার বড় বৌদি, সদা হাস্যময়ী , সাক্ষাৎ মা অন্নপূর্ণা- মকরি সরেন বৌদি স্বেচ্ছায় সব ভার নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। তার আগে বাচ্চা বাচ্চা মেয়েরা এসে সোনা রঙের কাঁসার ঘটি থেকে জল ঢেলে, কাপড় দিয়ে পা মুছিয়ে দিয়ে, একে একে সবাই ভূমিষ্ট হয়ে প্রনাম করল। কিচ্ছু করার নেই, এই রীতিই এখানকার দস্তুর। সরল আদিবাসীদের এই অকৃত্রিম ভালোবাসায় চোখ ভিজে উঠবে। নব্য বঙ্গজদের কাছে, এসব হয়ত ফালতু মনে হবে। বাচ্চা মেয়ে বলতে যাঁদের বুঝিয়েছি, সেই শান্তি হেমব্রম, শ্যামলী সরেন ইত্যাদি ভাইজি, ভাগ্নীরা সবাই কমপক্ষে এম এ পাস এবং স্কুল শিক্ষিকা।
আমরা উঠেছি, শ্রী মহেন্দ্রনাথ সরেন এই বাঁশকানালি গ্রামের মোড়লের বাড়িতে। এনার ছোটভাই ডাক্তার এবং আমার স্ত্রীর সহকর্মী। ডাক্তার ও সপরিবারে এসেছে। একগাড়ি পল্টন এসে তিনদিনের জন্য খুঁটি গেড়ে বসলাম, মোড়লের বাড়িতে। কিন্তু মোড়ল ই তো এই আনন্দ উৎসবের মুখ্য হোতা। আমাদের সামলাবে কে ? কুছ পরোয়া নেই, মোড়ল মশাইয়ের বৌদি, আমাদের সবার বড় বৌদি, সদা হাস্যময়ী , সাক্ষাৎ মা অন্নপূর্ণা- মকরি সরেন বৌদি স্বেচ্ছায় সব ভার নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। তার আগে বাচ্চা বাচ্চা মেয়েরা এসে সোনা রঙের কাঁসার ঘটি থেকে জল ঢেলে, কাপড় দিয়ে পা মুছিয়ে দিয়ে, একে একে সবাই ভূমিষ্ট হয়ে প্রনাম করল। কিচ্ছু করার নেই, এই রীতিই এখানকার দস্তুর। সরল আদিবাসীদের এই অকৃত্রিম ভালোবাসায় চোখ ভিজে উঠবে। নব্য বঙ্গজদের কাছে, এসব হয়ত ফালতু মনে হবে। বাচ্চা মেয়ে বলতে যাঁদের বুঝিয়েছি, সেই শান্তি হেমব্রম, শ্যামলী সরেন ইত্যাদি ভাইজি, ভাগ্নীরা সবাই কমপক্ষে এম এ পাস এবং স্কুল শিক্ষিকা।
বিশাল উঠোন, পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে। সারি সারি খাটিয়া পাতা। এতেই চলেছে, গান, আড্ডা, নাচের মহড়া। তালবাদ্যের রণ সংগীতে, এর মধ্যেই রক্ত গরম হতে শুরু করেছে। ঝকঝকে নিকানো উঠোনে, এই বাড়ির মেয়েদের হাতে বোনা আসনে বসে, বড় বৌদির হাতের অমৃত সম রান্নার স্বাদ, সারা জীবনের মণিকোঠায় তোলা থাকলো।রাত নয়টা থেকে পুরোহিতের বাড়িতে তুলসীমঞ্চকে ঘিরে শুরু হয়েছে অনুষ্ঠান । আধো অন্ধকারে এক আধি দৈবিক, আধি ভৌতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ধামসা, মাদল, রেগড়া, সাঁকোয়া কত রকম বাদ্যযন্ত্র , বিশাল জায়গাজুড়ে কি অসাধারণ একটি পরিবেশ তৈরি করেছে, লিখে বোঝান যাবেনা। তিনদিনের উৎসবের আজকে অনুষ্ঠানের প্রথম দিন, ওঁম ।

মোড়লের ঘর
মোড়ল মশাইকে ঘিরে গল্প শুনছি। ঠিক গল্প নয়, অজানা সংস্কৃতির গল্প। এই গল্প আমাদের শোনানো হয়না। যে অস্ট্রিক সভ্যতা- ভারতীয় সভ্যতার অন্যতম ভিত্তি, তাঁদের কথা তাঁদের উত্তরসূরিদের মুখ থেকেই শোনা যাক।
মহেন্দ্রনাথ সরেন হচ্ছেন মোড়ল বা মাঝি হাড়াম। ইনি হচ্ছেন এই গ্রাম সমাজের মুখ্য কর্তা। এ ছাড়াও আরো চারজন কর্তা আছেন। পারানিক বা পরামানিক , পরামানিকের সহকারী- জগ পারানিক, গোড়ায়েৎ বা কাইলি( উৎসবের বার্তাবাহক), জগ মাঝি( মরাল পুলিশ বলা যায়)।
এই যে বাহা- মা মড়ে অনুষ্ঠানে আমরা এসেছি, এর নির্ঘন্ট কিন্তু তৈরি করেছেন- সমাজ কর্তারা মিলে । একটি (জেনারেল বডি মিটিং) আলোচনা সভা বা ” কুলহি দুড়ুপ:” এ বসে এই নির্ঘন্ট তৈরি হয়েছিল।
মহেন্দ্রনাথ সরেন হচ্ছেন মোড়ল বা মাঝি হাড়াম। ইনি হচ্ছেন এই গ্রাম সমাজের মুখ্য কর্তা। এ ছাড়াও আরো চারজন কর্তা আছেন। পারানিক বা পরামানিক , পরামানিকের সহকারী- জগ পারানিক, গোড়ায়েৎ বা কাইলি( উৎসবের বার্তাবাহক), জগ মাঝি( মরাল পুলিশ বলা যায়)।
এই যে বাহা- মা মড়ে অনুষ্ঠানে আমরা এসেছি, এর নির্ঘন্ট কিন্তু তৈরি করেছেন- সমাজ কর্তারা মিলে । একটি (জেনারেল বডি মিটিং) আলোচনা সভা বা ” কুলহি দুড়ুপ:” এ বসে এই নির্ঘন্ট তৈরি হয়েছিল।
মা: অর্থ জাহেরআয়ু মা, যিনি আবার সৃষ্টিকর্তা মারাং বুরুর স্ত্রী। আর মড়ে অর্থ পাঁচ। বৃহত্তর অর্থে পাঁচ ঠাকুরের কাছে মানসিকের কমপক্ষে পাঁচটি পাঁঠা/ছাগল বলি। বসন্ত উৎসবের বা ফুলের উৎসবের অনুষ্ঠান বাহা পড়ব তো চৈত্র মাসে হয়ে গেছে। কিন্তু বংগা দেবতার থানে যারা মানসিকের ব্রত করেছিল, সেই মানসিকের ব্রত রাখা মানুষ গুলির জন্য, বুদ্ধ পূর্ণিমার পরের পূর্ণিমায় এখানে পালন করা হয় মা: মড়ে উৎসব। মারাং বুরু, জাহেরআয়ু, মড়ে-কো-তুড়েইক, সেন্দ্রা বঙ্গা, হারাং বঙ্গা- এই পাঁচটি মুখ্য দেব-দেবীর থানে চারটি পাঁঠা ও একটি ছাগি বলি হচ্ছে পুজোর অঙ্গ। জাহের আয়ু দেবীর নামে ছাগি বলি হয়।এই মুখ্য দেবতাদের থানেই আছেন রস্কে বঙ্গা। ইনি সাঁওতাল সমাজের রসে বসে থাকা আনন্দের ঠাকুর বলতে পারি।

এই বলি উৎসব কিন্তু হবে দ্বিতীয় দিনে, অর্থাৎ আগামীকাল, যাকে বলা হয় সারদি-র দিনে।রাত নয়টায় ঢুকলাম- প্রধান পুরোহিত বা নাইকির বাড়ির উঠানে। লোকে লোকারণ্য। দুই দিকে বাজনাদারেরা বসে গ্যাছে তাঁদের বাজনার যন্ত্র নিয়ে।আরেকদিকে মেয়েরা বসে। বাকি দিকে নাইকি- বীরেন সরেনের ঘর। মূল ধর্মীয় অনুষ্ঠান চলছে, নাইকির উঠানের তুলসী মঞ্চ ঘিরে। নাইকির সহকারী একটি কম বয়সী ছেলে- যাকে ডাকা হয় ” কুডম নাইকি” বলে।
একদিকে পুজো আর্চা চলছে, মাঝে মধ্যে ধুনোর ধোঁয়ায় চারদিক অন্ধকার। সমস্ত ইলেকট্রিক আলো নিভিয়ে দিয়ে একটিমাত্র হ্যাজাকের আলোতে এতবড় অনুষ্ঠান চলছে।
একদিকে পুজো আর্চা চলছে, মাঝে মধ্যে ধুনোর ধোঁয়ায় চারদিক অন্ধকার। সমস্ত ইলেকট্রিক আলো নিভিয়ে দিয়ে একটিমাত্র হ্যাজাকের আলোতে এতবড় অনুষ্ঠান চলছে।
ধামসা, মাদল, খোল এগুলি সবই হচ্ছে আনন্ধ শ্রেণীর বাদ্যযন্ত্র, অর্থাৎ প্রতিটি বাদ্যযন্ত্র চামড়ার আচ্ছাধন দিয়ে তৈরি।ধামসা বা নাগারা আদিতে রণসঙ্গীত হিসাবে যুদ্ধের সময় বাজানো হত। তবে বর্তমানে মানভূম এবং ছোটনাগপুর জেলার বিভিন্ন নৃত্যগীত এবং শোভাযাত্রায় ব্যাপকভাবে এটি বাজানো হয়। ধামসা বা নাগারার অন্য নামগুলো হচ্ছে টিকারা, দামামা, ঢক্কা, ডঙ্কা ইত্যাদি( Samuel Johnson 1834, A Dictionary in English and Bengalee.)
আগে শিশুকাঠ দিয়ে ধামসার খোল তৈরি হতো। তবে বর্তমানে লোহার চাড়ির মুখে গরু বা মহিষের চামড়া দিয়ে এর ছাউনী তৈরি হয়। ছাউনী তৈরিতে গাব(গাব ফলের আঠা) বা খিরণ লাগানো হয় না।
ধামসা দুটি মোটা কাঠির সাহায্যে বাজানো হয়। ধামসা কিন্তু ছোট ও বড় – দুটি মাপের হয়। বোলের শব্দ শুনে দ্রিমি দ্রিমি, দ্রিম দ্রিম ধ্বনি বলে মনে হয়। বাঁশ পাহাড়ির অনুষ্ঠানে দুই সাইজের ধামসা দেখতে পেলাম।
প্রায় এরকমই আওয়াজ বেরোচ্ছে আরেকটি বিশাল বাদ্যযন্ত্র থেকে। এটির নাম রেগড়া। এটি কিন্তু সমান দৈর্ঘ্যের দুটি কাঠি দিয়ে বাজানো হচ্ছে।
বিশাল আকারের মহিষের শিঙে প্রস্তুত আরেকটি বাদ্যযন্ত্র হচ্ছে সাঁকোয়া। শিঙের মধ্যে একটি ফুটো থাকে। এই ফুটোতেই ফুঁ দিয়ে সুর তুলছে। মধ্যে মধ্যে শিল্পীকে যন্ত্রের মধ্যে জল ঢেলে পরিষ্কার করতে দেখলাম। সাঁকোয়া বহু প্রাচীন বাদ্যযন্ত্র। একজন শিল্পীর সঙ্গে আলাপ হল- ওনার নাম লখিন্দর মুর্মু। উনি এই যন্ত্র বাজাতে শিখেছেন উনার গুরু মহেন্দ্রনাথ সরেনের কাছে।

এবার আসি মাদলে।
মাদল দেখতে অনেকটা সিলিনড্রিকাল , এরকমই দেখতে একটু ছোট বাদ্যযন্ত্র কে লাগা বলে। এটি তৈরিতে পোড়ামাটির খোল লাগে। এখানেও খোলা মুখ দুটিতে গরু/মোষের চামড়ার ছাউনী লাগানো হয়। ছাউনির মাঝখানে গাব ফলের আঠা বা খিরণ লাগিয়ে চামড়া শক্ত ও টেকসই করা হয়। এছাড়া খোলের উপর তবলার মতন সরু সরু চামড়ার ফিতের বাঁধি লাগানো হয়। নাচ গানের সময় বেশির ভাগ জায়গায়, দুটি মাদল এবং একটি লাগা ব্যবহার করা হয়। তাই দুটি মাদল এবং একটি লাগা নিয়ে মাদলের একটি সেট হয়। আদিবাসী নাচে গানে, ঝুমুর গান এবং নাচে, মাদল বাজবেই।
মাদল দেখতে অনেকটা সিলিনড্রিকাল , এরকমই দেখতে একটু ছোট বাদ্যযন্ত্র কে লাগা বলে। এটি তৈরিতে পোড়ামাটির খোল লাগে। এখানেও খোলা মুখ দুটিতে গরু/মোষের চামড়ার ছাউনী লাগানো হয়। ছাউনির মাঝখানে গাব ফলের আঠা বা খিরণ লাগিয়ে চামড়া শক্ত ও টেকসই করা হয়। এছাড়া খোলের উপর তবলার মতন সরু সরু চামড়ার ফিতের বাঁধি লাগানো হয়। নাচ গানের সময় বেশির ভাগ জায়গায়, দুটি মাদল এবং একটি লাগা ব্যবহার করা হয়। তাই দুটি মাদল এবং একটি লাগা নিয়ে মাদলের একটি সেট হয়। আদিবাসী নাচে গানে, ঝুমুর গান এবং নাচে, মাদল বাজবেই।
খোলও একটি পোড়ামাটির বাদ্যযন্ত্র।মৃৎ বা মাটির তৈরি বলে এর আরেকটি নাম মৃদঙ্গ। খোলের আকার অনেকটা কলার মোচার আকৃতির। দুই দিকের খোলা মুখ দুটিতে চামড়ার আচ্ছাদন বা ছাউনী লাগানো হয়। ডানদিকের মুখটি অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র , বামদিকের মুখের চেয়ে। এখানেও চামড়ার মাঝখানে গাব বা খিরণ লাগান হয়।বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে, কীর্তন গানের সঙ্গে খোলের বহুল ব্যবহার করা হয়, তাই একে কীর্তন খোল ও বলে।
রাত একটা বেজে গেছে, , নাচ- গান, ধর্মীয় অনুষ্ঠান চলছেই। শুনলাম চলবে রাত তিনটে অবধি। অনেকের উপরে দেখলাম দেবতার ভর হয়েছে। তাঁদের ব্যাবহার ও চলন বলন, কেমন অদ্ভুতভাবে বদলে যাচ্ছে।
ফিরে এলাম ঘরে। সত্যিকারের রাম রাজত্ব দেখতে হলে এই সাঁওতাল গ্রামগুলিতে আসতে হবে। এত লোক রাস্তা দিয়ে চলাচল করছে, বাইরে থেকে এত লোক এসেছে, বাড়ির সামনে থেকে পিছন অবধি সব দরজা/জানলা খোলা। আমি তো চাঁদের আলোয় শুয়ে পড়লাম, উঠানের খাটিয়াতে। শেষ রাতে শুনি মাথার উপরে মোরগের ডাক। তখনও ঠিকমতন আলো ফোটেনি, কিছু বুঝতে না পেরে, মাথার উপরের আমগাছে ,টর্চের আলো ফেলে চক্ষুস্থির। গাছের উপরে কাতারে কাতারে মুরগি চড়ে বসেছে। এমন অদ্ভুত দৃশ্য, জীবনে প্রথম দেখলাম।

পরের দিন সকালে এই মুরগি রহস্য উদ্ধার হল। এখানে প্রত্যেকের ঘরেই লড়াকু কাশিপুর মোরগ পোষা হয়। এই মোরগ পোষা হলেও, মোটামুটিভাবে উড়তে পারে। চোর ডাকাত না থাক, মুরগির খোঁজে শিয়াল বা হুরাল প্রায় গ্রামে হানা দেয়। তাই ডারউইন সাহেবের মতকে মেনে নিয়ে এরাও শিয়ালকে কাঁচকলা দেখিয়ে, রাতের বেলা গাছের মগডালে চড়ে বসে থাকে- survival for the fittest .

হ্যাজাকের আলোতে নাচ-গানের মহড়া
তথ্যসূত্র
১) আবাদভূমি, তৃতীয় বর্ষ, সপ্তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৬ – এপ্রিল ২০১৭।
২)সুহৃদকুমার ভৌমিক । আর্য্ রহস্য। মনফকিরা।
৩) আদিবাসী সমাজ ও পালপার্বন : ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে।লোকসংস্কৃতি ও আদিবাসী সংস্কৃতি কেন্দ্র, পশ্চিমবঙ্গ সরকার।
৪) বাংলার জনজাতি, প্রদ্যোত ঘোষ। পুস্তকবিপণি।
Subscribe to:
Comments (Atom)









